জাতীয় ফিচার

“জাতি ২০০৯ সালের বিডিআর ঘটনা পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের সরকার গঠনের মাত্র ৫২ দিনের মাথায় ২০০৯ সালে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে (তৎকালীন বিডিআর)।পুরো জাতি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দপ্তরের অভ্যন্তরে বীর উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দিবস-২০২২’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে বিজিবি সদস্যদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, যা যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার প্রধান আরো বলেন, ‘একটা কথা মাথায় রাখবেন। কখনও শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটাবেন না। অর্পিত দায়িত্ব মেনে চলবেন, চেইন অব কমান্ড মেনে চলবেন।’

শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি কর্তব্যনিষ্ঠ হওয়াার জন্য তিনি বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে ১৯৭৪ সালের ৫ই ডিসেম্বর তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস-এর সদস্যদের উদ্দেশে দেয়া জাতির পিতার ভাষণের চুম্বকাংশ উদ্ধৃত করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন:‘ঈমানের সাথে কাজ কর; সৎ পথে থেকো, দেশকে ভালোবাস। , এই দেশ আমাদের, দেশ যত উন্নত হবে আপনাদের পরিবারই ভাল থাকবে, সুস্থ থাকবে। উন্নত জীবন পাবে, শিক্ষা-দীক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানসহ সবধরণের সুযোগ পাবে। সে কথা সবসময় মনে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, বর্ডার গার্ড আইন ২০১০ পাশের পর এই বাহিনীকে আমরা আধূনিক ও যুগোপযোগী করে গঠন করেছি। আমার বিশ^াস আধুনিক সীমান্ত রক্ষী বাহিনী হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার লক্ষ্য অর্জনে।

একটি পেশাগত ও সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, আমি বিশ্বাস করি, যেকোন পেশাদার বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুশৃঙ্খল ও দক্ষ বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বিজিবি সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য সাতকানিয়ার ‘বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার এন্ড কলেজ’ এর পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গায় আরও একটি প্রশিক্ষণ সেন্টার স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

জাতির পিতা যেভাবে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন আজকে আওয়ামী লীগ সরকার সেই পদক্ষেপই নিয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি গৃহহীন-ভূমিহীনদের বিনামূল্যে ঘর এবং জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কারণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দেশে একটি মানুষও ভুমিহীন-গৃহহীণ থাকবে না, ইনশাল্লাহ। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, প্রত্যেকটা মানুষের জন্য একটা ঠিকানা গড়ে দেয়ার পাশাপাশি সকলের হাতে আজকে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সার্ভিস, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপন, ফ্রিল্যান্সিং, তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সর্বক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। যে দেশকে জাতির পিতা যুদ্ধ বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে গড়ে তুলে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে গিয়েছিলেন। আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনকালিনই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। এটা আমাদের ধরে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। যদিও কোভিড-১৯ মহামারির বিশ^ব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, তার ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও একে কেন্দ্র করে নিষেধাঞ্জা ও পাল্টা নিষেধাঞ্জার ফলে সারাবিশে^ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশে যাতে এই মন্দা না আসে সেজন্য আমাদেরকেই তার ব্যবস্থা নিতে হবে। কারো কাছে হাত না পেতে নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করে আমরা নিজেরা নিজেদের মতই চলবো, মাথা উঁচু করে চলবো।

শেখ হাসিনা বলেন, এই কারণেই আমি আহবান করেছি এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি পড়ে না থাকে, প্রতিটি ইঞ্চিতে যে যা পারেন তা উৎপাদন করবেন।

প্রতিটি বিওপিতেই আমাদের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা কিছু না কিছু উৎপাদন করছেন বা পশু পাখি পালন করায় তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানান।

জাতির পিতার স্বপ্ন পূরনের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ হবে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ,স্মার্ট বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ ই-ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করবে।’

দেশকে আরো এগিয়ে নিতে ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান অর্থাৎ এই ভূখন্ড এই ব-দ্বীপ অঞ্চলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন উন্নত জীবন পেতে পারে সেই পদক্ষেপও আমরা নিয়েছি। সে জন্য প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের কাজও আমরা শুরু করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বিজয়ের এই মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারি বীর বিজিবি (তৎকালিন ইপিআর) সৈনিকদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ইপিআর-এর বেতার কর্মীরা ওয়্যারলেস যোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা সমগ্র দেশে প্রচার করেছিল। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করায় ইপিআরের সুবেদার মেজর শওকত আলীকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। বিজিবি শহীদদের মধ্যে ২ জন বীর শ্রেষ্ঠ, ৮ জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম এবং ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হন। এছাড়া, এ বাহিনীর ৮১৭ জন সদস্য মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন।

তিনি বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের ওপর দেশের সীমান্ত রক্ষার মহান দায়িত্ব অর্পিত। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি চোরাচালান রোধ, মাদক ও নারী-শিশু পাচার রোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনসহ সীমান্তবর্তী জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষা করা আপনাদের দায়িত্ব।

এসব দায়িত্ব অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে যাওয়ায় তিনি বিজিবি সদস্যদর আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং এই দায়িত্ব পালনে সবসময় যেন সকলে সচেষ্ট থাকেন সে প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।

জাতির পিতা তাঁর মাত্র ৪৪ মাসের শাসনামলেই ভারতের সাথে চুক্তি করে আমাদের সংবিধান সংশোধন করে সীমান্ত নির্দিষ্ট করে গেলেও ’৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো তা বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ না নেয়ায় ছিটমহল বিনিময় হয়নি বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আমরা এই উদ্যোগ নিই এবং দ্বিতীয় বার যখন সরকারে আসি তখন ভারতীয় পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে আইন পাশের মাধ্যমে এই সীমান্ত সুনির্দিষ্ট করা হয়। অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে আমরা ছিটমহল বিনিময় করে সারাবিশে^ একট দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হই, যা অন্য কোন দেশ কখনো পারেনি। এক্ষেত্রে বর্ডার গার্ডের দায়িত্বশীলতারও তিনি প্রশংসা করেন। পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দেখভালোও তাদের বিশেষ ভুমিকার উল্লেখ করেন তিনি। সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখায় তাদের পেশাদারিত্বের প্রশংসাও করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিজিবি’র সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিজিবি পুনর্গঠনের আওতায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে। ফলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি দক্ষ, শক্তিশালী আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠানিক রূপলাভ করেছে।

তিনি বলেন, বিজিবি’র সাংগঠনিক কাঠামোতে নতুন ইউনিট/সেক্টর/রিজিয়ন সৃষ্টির ফলে কমান্ডস্তরে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সুষ্ঠুভাবে সীমান্ত সুরক্ষা, সীমান্ত অপরাধ দমন এবং সীমান্তবর্তী জনসাধারণের জানমাল রক্ষা করা আগের চেয়ে সহজতর হয়েছে।

 

আরও পড়ুনঃ তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন ১৩ বিদেশি সাংবাদিক

রিপোর্টার

About Author

2 Comments

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র